এক দশক আগেও ফরিদপুরের বিভিন্ন স্থানে শীতের সকালে চোখে পড়তো খেজুর রসের হাঁড়ি ও খেজুর গাছ কাটার সরঞ্জামসহ গাছিদের ব্যস্ততার দৃশ্য। খেজুর গাছ কমার সাথে সাথে বিলুপ্ত হতে চলেছে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা গাছিদের এই পেশা।
এদিকে, কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে খেঁজুর গাছ, তাই নেই তেমন গাছিও। ফরিদপুরের খেজুরের গুড় ও পাটালির খ্যাতি আছে দেশজুড়ে। এই গুড় খাঁটি হওয়ায় স্বাদে অতুলনীয়। গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে রাসায়নিক কোনও দ্রব্য ব্যবহার ছাড়াই খাঁটি গুড় তৈরি করেন এখানকার গাছিরা। সে কারণে এখানকার খেজুরের গুড়ের সুনাম আছে।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গুড় নিতে আসেন বিভিন্ন জেলার মানুষজন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও যায় খেজুর গুড়। তবে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় ক্রেতাদের চাহিদামতো গুড় দিতে পারেন না গাছিরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিনে দিনে খেজুর গাছ কমছে আর গাছিদের পেশা বদলে যাচ্ছে। নতুন করে এ গাছি পেশায় কেউ না আসায় ফরিদপুর থেকে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে গাছি। বর্তমানে প্রতি গ্রাম তো দূরে থাক কয়েক গ্রাম খুজেও পেশাদার একজন গাছির সন্ধান মিলবে কিনা সন্দেহ।
এক যুগ আগেও ফরিদপুরের ৯টি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মেঠো পথে, বাড়ির আঙ্গিনায়, জমির আইলে চোখে পড়তো সারি সারি খেজুর গাছ। এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামে বা মহল্লায় গাছিদের দেখা যেত খেজুর গাছের মাথার দিকে বিশেষ কায়দায় কাণ্ড ছেটে খেজুর রস সংগ্রহে মাটির হাড়ি পাততে। শীতের সকালে গাছিরা খেজুর রসের হাড়ি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো। এখন আর বিস্তৃর্ণ এলাকা ঘুরেও চোখে পড়ে না খেজুরের গাছ কিংবা গাছিদের খেজুরের রস নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো। তবে কিছু কিছু এলাকায় অল্প কিছু খেজুর গাছ চোখে পড়লেও সেগুলো যেন কালের স্বাক্ষী হয়ে কোনমতে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস-গুড়ের যে সুখ্যাতি ছিল তা দিনে দিনে কমছেই। গাছিরা তাদের শীতকালের এই পেশা ছেড়ে জড়িয়ে গেছে অন্য কাজে।
আলফাডাঙ্গার পাঁচুড়িয়া গ্রামের একজন প্রবীণ গাছি মো. মফিজুর রহমান(৬৬) জানান, প্রায় ৩৫ বছর ধরে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহের কাজ করেছি। এখন আগের মত খেজুর গাছ নেই। তাই গাছ কাটা বন্ধ করে দিয়েছি। তারপরও অল্প কয়েকটি গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। শীতের সময় মাস তিনেক তিনি এই কাজ করেন। বছরের বাকি সময় তিনি নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।
জাটিগ্রামের মালেক শেখ নামের আরেক গাছি জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করে জীবীকা নির্বাহ করেছি। এখন খেজুর গাছ নেই। তাই পেশা পরিবর্তন করে কৃষি কাজ করি।
ভাঙ্গা উপজেলার ভাঙ্গারদিয়া, সদরদী ও ভদ্রকান্দা গ্রামে বেশ কয়েকজন পুরাতন গাছিদের মধ্যে সুজন পাল, আক্কাস আলী, তোতা মিয়া বলেন, খেঁজুর গাছ বিলুপ্তির জন্য অধিক জনসংখ্যা দায়ী। বাড়ি করার জন্য জায়গা ও কাঠের প্রয়োজন। এর জন্য গ্রামের খেজুরের বাগান কেটে সেখানে বাড়ি তৈরি করছেন। আগে প্রায় বাড়ি গাছি পাওয়া যেত কিন্তু বেশির ভাগ পুরাতন গাছি মারা গেছেন। আবার ছেলে মেয়েরা অন্য পেশায় গিয়ে অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেছে যার কারণে এই পেশা অনেকে ছেড়ে দিয়েছেন।
এদিকে, ফরিদপুরে স্থানীয় গাছি বিলুপ্তির কারণে রাজশাহী থেকে এ জেলায় এসে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করছেন। গত কয়েক বছর ধরে শীতের সময় এরা দল বেঁধে ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় আসেন। প্রতিষ্ঠান ও খেজুর গাছ মালিকের কাছ থেকে খেজুর গাছ ভাড়া নিয়ে শীত মৌসুমের তিন মাস ধরে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করেন।
ফরিদপুর শহরতলীর গঙ্গাবর্দী এলাকার কৃষি ইনস্টিটিউট এলাকায় এমন বেশ কয়েকজন গাছির সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই এলাকার বাসিন্দা এনামুল হাসান গিয়াস বলেন, খেজুর গাছের সংখ্যা দিনে দিনে কমছেই। তাছাড়া গাছ কেটে রস বের করার মতো গাছিও বিলুপ্তির পথে। রাজশাহী, যশোরসহ দূর-দূরান্তের বিভিন্ন জেলা থেকে গাছি এনে তিনি প্রায় ১৫০০ খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করছেন।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দিঘা গ্রাম থেকে আসা গাছি মো. লালন আলী বলেন, নভেম্বর মাসের শুরুতে দুইজন সহযোগীকে নিয়ে ফরিদপুরে এসেছি। ফরিদপুরের কৃষি কলেজ ও আশপাশের প্রায় দেড় শতাধিক খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করছি।
সেলিম মণ্ডল ও আরশাদ শেখ নামের দুই গাছি বলেন, আমাদের বাড়ি রাজশাহী। এখানে সাড়ে তিনমাস মাস থাকব। এ সময় থাকা-খাওয়া ও গুড় তৈরির জ্বালানি খরচ বাদে একেকজন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরবো বলে আশা করছি।
সরেজমিনে জেলা সদরের গঙ্গাবর্দী এলাকার কৃষি ইনস্টিটিউট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। রস চুলায় জ্বাল দেয়ার প্রায় দেড় ঘণ্টা পর গুড় তৈরি হয়। এ সময় বেশ কয়েক জন ক্রেতাকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
দীর্ঘদিন ধরে খেজুরের গুড় বিক্রি করছেন কৃষি ইনস্টিটিউট এলাকার বাসিন্দা এনামুল হাসান গিয়াস। তিনি বলেন, আগের চেয়ে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে। তাছাড়া গাছ কেটে রস বের করার জন্য গাছি পাওয়া যায় না। রাজশাহী ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে গাছিদের আনতে হয়।
তিনি বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে দেড় হাজার খেজুর গাছ দেখভাল করছি। নিপা ভাইরাসের সংক্রমণরোধে প্রতিটি গাছে রস সংগ্রহের সময় হাঁড়ির মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখি। এই গাছগুলো থেকে রস সংগ্রহের জন্য রাজশাহী ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে গাছিদের নিয়ে আসি। জেলার বিখ্যাত খেজুরের গুড় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছি। রসের জন্য জেলার বিভিন্ন মালিকদের খেজুর গাছ বছর চুক্তিতে লিজ নিই।
এনামুল হাসান আরও বলেন, সারা দেশে এই জেলার গুড়ের চাহিদা রয়েছে। দেশের বাইরেও গুড় পাঠাই। তবে রসের জোগান কম থাকায় গুড় দিতে হিমশিম খেতে হয়।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দিঘা গ্রামের বাসিন্দা মো. লালন আলী প্রামাণিক ফরিদপুরে এসেছেন নভেম্বর মাসের শুরুতে। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তিন সহযোগী। লালন প্রামাণিক বলেন, কৃষি ইনস্টিটিউট ও আশপাশের এলাকার ১৫০টি খেজুর গাছ আমরা তিন জন দেখভাল করছি। নভেম্বর মাসের শুরুতে এসেছি। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বাড়িতে যাবো।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি গাছ আমরা ৩০০ টাকা করে এক বছরের জন্য লিজ নিয়েছি। গাছ কাটার পর প্রথম এক মাস রস তেমন বের হয় না। পরের দুই মাস রস পাওয়া যায়। এখন মোটামুটি রস পাচ্ছি। রস বিক্রি করছি ৪০ টাকা লিটার। এক হাঁড়ি রস (আট লিটার) ৩৫০ টাকায় বিক্রি করছি। ঝোলা গুড়ের কেজি ৩০০ এবং পাটালি ৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছি।
রাজশাহী থেকে আসা গাছি গিয়াস মন্ডল বলেন, বাদুড় যাতে রসের হাঁড়ির ওপর বসতে বা মুখ দিতে না পারে সেজন্য নীল কাপড় দিয়ে হাঁড়ির মুখ বেঁধে দেয়া হয়। নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। প্রতিদিন ১৫০টি গাছের মধ্যে ৮০টি থেকে রস সংগ্রহ করি। এতে প্রতিদিন ২৫০ লিটার রস পাই। এই রসে প্রতিদিন ১৫ কেজি গুড় হয়।
তিনি আরও বলেন, সরাসরি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে কোনও প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো ছাড়াই গুড় তৈরি করি। অনেকে সামনে দাঁড়িয়ে থেকে গুড় তৈরি করে নিয়ে যান। রস থেকে যে পরিমাণ গুড় হয় তাতে ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করা যায় না। অনেককে গুড় দিতে পারি না।
আরেক গাছি আরশাদ শেখ বলেন, গাছে ওঠা অনেক ঝুঁকির কাজ। ঝুঁকির কারণে অনেকে এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। ফরিদপুরে এসেছি, এখানে চার মাস থাকবো। এই চার মাসে থাকা-খাওয়া ও গুড় তৈরির জ্বালানি খরচ বাদে একেকজনের ৭০-৮০ হাজার টাকা লাভ হবে। যদি রস বেশি পাই তাহলে আরও বেশি লাভ হবে। কৃষি ইনস্টিটিউট এলাকায় গুড় কিনতে এসেছেন সদর উপজেলার কানাইপুরের রহিম শেখ।
তিনি বলেন, এখানে ভেজালমুক্ত গুড় পাওয়া যায়। তাই কিনতে এসেছি। আগে দুই কেজি নিয়েছিলাম। ছেলে বিদেশে থাকে। তার জন্য পাঠাবো, তাই আরও কয়েক কেজি নিতে এসেছি। কিন্তু তারা আজ দিতে পারলেন না। বললেন কয়েকদিন দেরি হবে। ৪০০ টাকা দরে তিন কেজি পাটালির দাম এক হাজার ২০০ টাকা দিয়ে গেলাম, পরে এসে নিয়ে যাবো।
এ বিষয়ে ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জিয়াউল হক বলেন, ফরিদপুরের খেজুর গুড়ের দেশব্যাপী সুনাম আছে। কিন্তু নানা কারণে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফরিদপুরে গাছির সংখ্যাও বিলুপ্তির পথে। গাছ ও গাছি সংকটের কারণে গুড়ের উৎপাদনও দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে খেজুর গাছ লাগানোর পাশাপাশি খেজুর গাছ রোপণে উৎসাহী করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন